যে রেললাইন হতে পারত বাংলাদেশকে বদলে দেওয়া যোগাযোগ নেটওয়ার|



হারিয়ে যাওয়া রেলপথের স্মৃতি ও মেঘনাপাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্দশা

যারা গুলিস্তান থেকে বিষনন্দী ফেরীঘাট হয়ে বাঞ্ছারামপুর যাতায়াত করেন, কিংবা ফেরীঘাট হয়ে মাধবদী-শেখেরচর হয়ে ঢাকায় আসেন, তারা নিশ্চয়ই মদনপুর-আড়াইহাজার সংযোগ সড়কটির কথা জানেন। এই সড়কটি সোজা আড়াইহাজার পায়রাচত্বর হয়ে মাধবদী দিয়ে নরসিংদীতে চলে গিয়েছে। অনেকে হয়তো জানেন না—এই সড়কটি নির্মিত হয়েছে একটি পুরনো রেললাইনের উপর, যার ইতিহাস প্রায় বিস্মৃতপ্রায়।

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন

আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলে রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। ভৈরব রেলসেতু নির্মাণের পর তাঁরা আরও দুটি রেলসেতু নির্মাণের প্রজেক্ট হাতে নেয়—একটি গজারিয়া হয়ে, আরেকটি আড়াইহাজার-বিষনন্দী হয়ে। লক্ষ্য ছিল, পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে রেলপথে সংযুক্ত করা।

তবে ১৯৪৭ সালের পর ব্রিটিশরা বিদায় নেয়, পাকিস্তান সরকার আসে। তারা যদিও ব্রিটিশদের কিছু প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে, যেমন—নরসিংদী-আড়াইহাজার-মদনপুর-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইন, তবু পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। তখনকার দিনে বাঞ্ছারামপুরের মানুষ নদী পার হয়ে নরসিংদী থেকে আধুনিক EMU বা DEMU ট্রেনে চেপে ৪০ মিনিটেই ঢাকায় পৌঁছে যেতেন। যেন এখনকার মেট্রোরেলের আগেই এক উন্নত ব্যবস্থা!

রেললাইন উঠিয়ে রাস্তায় পরিণত

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন সরকার এই প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করার পরিবর্তে উল্টো কাজ করল—রেললাইন উঠিয়ে সেখানে সড়ক বানাল! বিষনন্দী-বাঞ্ছারামপুর রেললাইন প্রকল্প তো ধরেইনি, বরং বিদ্যমান নরসিংদী-আড়াইহাজার রেললাইনও তুলে ফেলেছে। সরকার বলেছিল, এই অঞ্চলের জন্য রেললাইন নাকি "বিলাসিতা"! অথচ শত কিলোমিটার পথ এক ঘন্টারও কম সময়ে ট্রেনে যাতায়াতকারী মানুষের জন্য তা ছিল এক জীবন্ত প্রয়োজন।

আজকে আপনি সেই সড়ক দিয়ে গেলে দেখবেন, অনেক ছোট ছোট ব্রীজের ভিত্তি এখনো রেলব্রীজের মতো। কারণ এগুলোরই নীচে একসময় রেল চলতো। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, যেখানে সরকার বিনা খরচে এই রেলপথকে সড়কে রূপান্তর করতে পারতো, সেখানে তারা বুলডোজার চালিয়ে ইতিহাস মুছে দিয়েছে।

সম্ভাবনার শেষবিন্দু

ব্রিটিশদের পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। বর্তমান ৩০০ ফিট সড়ক ধরে ভুলতা, গাউসিয়া, আড়াইহাজার, বিষনন্দী হয়ে সেতু পার করে বাঞ্ছারামপুর-আখাউড়া হয়ে আগরতলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের। সেক্ষেত্রে আড়াইহাজার আর বাঞ্ছারামপুর হয়ে উঠতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলজংশন। বাঞ্ছারামপুর থেকে আরও একটি লাইন হোমনা হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত যেতো, যেখানে চট্টগ্রামের ট্রেন চলত—সরাসরি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে।

এই স্বপ্ন আজ ইতিহাসের পাতায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার যে উন্নতি হতে পারতো, তা আজ শুধুই ‘যদি হতো’ গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।




Post a Comment

0 Comments