বিয়ের পরেই আমি প্রথমবারের মত শুনতে শুরু করলাম যে আমি সুন্দরী নই।

 


বিয়ের পরেই আমি প্রথমবারের মত শুনতে শুরু করলাম যে আমি সুন্দরী নই। 

বিয়ের আগে আমি খুব একটা শুনিনি যে আমি খুব সুন্দরী। তবে, কোনদিন এটাও শুনতে হয়নি যে আমি সুন্দরী নই। নিজেও জানতাম যে আমি মোটামুটি চেহারার একজন। সুন্দরী নই এবং অসুন্দরীও নই। 
তবে আমার বিশেষ গুন আমার গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতা। বিয়ের আগে বহুবার তার প্রমাণ পেয়েছি। স্কুলে, কলেজে এবং পাড়াতেও। স্কুলের শিক্ষিকারা সব সময় বলত আমি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলি, কলেজে বান্ধবীরাও তাই বলত। পাড়াতেও অনেক খালাম্মাদের মুখে কিংবা বড় আপাদের মুখে শুনেছি আমার কথা বলার ভঙ্গী এবং ধরণ খুব সুন্দর। তবে কেউ কোনদিন বলেনি যে আমি সুন্দরী নই। 

আমি যে অসুন্দরী নই তার একটা প্রমাণও আছে। আমার কৈশোর কাল থেকে শুরু করে বিয়ের আগ পর্যন্ত বহুবার বহুজনের কাছে প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছি। এদের মধ্যে সবাই যে আমার সাথে কথা বলে প্রেমে পড়েছে তা নয়। আমাকে দেখেই প্রেমে পড়েছে। আমার অবশ্য কারো সাথে প্রেম করা হয়নি। 
আমি ভীতু ধরণের মেয়ে। আমার পরিবারও রক্ষণশীল। প্রেম, ভালবাসা, রোমান্স ইত্যাদির কথা চিন্তা করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বড়, মেজ, সেজ ভাইয়ার রাগী চেহারা। বাবার রাগী চেহারা তো ভয়ে ভাবতেই পারতাম না। ভয়ের অনুভূতির জোরে রোমান্স নামক কোন অনুভূতি কাজই করত না।

যেহেতু বড় তিন ভাই ছিল, মাঝে মাঝে তাদের বন্ধুরা বাসায় আসত। তাদের মধ্যে অনেকেই আমার প্রেমে পড়েছে। আমি সব সময় একটা পদ্ধতিই অবলম্বন করতাম। চুপচাপ হয়ে থাকা। কাউকে 'হ্যা' অথবা 'না' এসব জানানোর কোন প্রয়োজন মনে করতাম না। 
অবচেতন মনে আত্মবিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল যে আমি অসুন্দরী নই। অন্যভাবে বলতে গেলে বিষয়টা নিয়ে কখনও তেমনভাবে ভাবা হয়নি। কিন্তু ভীষণভাবে ভাবতে হলো বিয়ের পর। 

বিয়ে ঠিক হলো এক মধ্যস্হতাকারীর মাধ্যমে। দুই পরিবারের সব কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর পাত্রপক্ষের সামনে আমাকে যেতে হলো। তারাও আমাকে দেখে বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে আংটি পরিয়ে দিয়ে গেল। তখন মনে হলো আমার চেহারা দেখে সবাই খুশিতে গদগদ। 
আমার প্রবাসী স্বামী আমার ছবি দেখে, আমার সাথে ফোনে কথা বলে বিয়েতে মত দিয়ে দিল। মত দেয়ার পর থেকে বিয়ে হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন কয়েকঘন্টা করে কথা হোত আমাদের। মনে হোত আমার হবু স্বামী আমার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু এবং খাবি খাচ্ছে। 
দুই পরিবারের প্রচন্ড আগ্রহে বিয়েটা হয়ে গেল বর ছাড়াই। মানে আমার হবু স্বামী প্রবাসে থাকাকালীন সময়েই আমার বিয়েটা হয়ে গেল। টেলিফোন বিয়ে। 

বিয়ের আগ্রহটা বরপক্ষের পরিবারের যেমন ছিল তেমন আমাদেরও ছিল। বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ঝুলন্ত সম্পর্ক কোন মুরুব্বীরই পছন্দের ছিল না। তাছাড়া আমরা ফোনে এত কথা বলেছি যে মনে হোত বিয়ে নামক চুক্তিটাই আমাদের সামাজিক স্বীকৃতিতে একমাত্র বাঁধা। বিয়ে হয়ে গেলে সেই বাঁধাটাও আর থাকবে না। তো বিয়ে হয়ে গেল। 

সবাই খুশি। খুশি খুশি অবস্হার মধ্যেই আমার স্বামী এল প্রবাস থেকে। আগে থেকেই সব ব্যবস্হা করা ছিল। যেদিন আমার স্বামী এল সেদিনই অনুষ্ঠান হলো এবং আমি চলে গেলাম আমার শ্বশুরবাড়ি। 
শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই দেখি কেমন যেন সবকিছু অন্যরকম! 
বিশেষ করে আমার স্বামী আমার সামনেই তার বাবা-মাকে বলে ফেলল,

-আপনারা আমাকে এমন একটা বিয়ে কিভাবে করালেন? আমি কিভাবে এরকম একটা মেয়ের সাথে সারাজীবন থাকব?

আমি বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। আমার দোষ বুঝতে পারছিলাম না। গতকাল প্লেনে উঠার আগ পর্যন্ত লোকটা আমাকে খুব পছন্দ করত। হঠাৎ করে কি হলো! মনটা খুব অস্হির হয়ে রইল। 
বাসর রাতে মনে হলো লোকটা আমাকে খুবই পছন্দ করে। শারীরিক ভালবাসায় কেটে গেল বাসর রাত। কিন্তু পরদিন সকাল থেকে আবার সেই অবস্হা! আমাকে তার ভাল লাগে না। অর্থাৎ দিনে একরকম, রাতে একরকম। এরকম চলতেই লাগল!

আমার স্বামীর সাথে ওর পরিবারও ধীরে ধীরে যোগ দিল আমার সৌন্দর্য বিচারে! তারাও যেন আমাকে অপছন্দ করতে লাগল। কারণটা বুঝতেই পারছিলাম না। আস্তে আস্তে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। আমার চেহারা তাদের পছন্দ হয়নি বা হয়না। আমি প্রচন্ড বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়তে শুরু করলাম। নিজের চেহারাটা অপছন্দ করতে শুরু করেছিলাম সেসময়ে! মুষড়ে পড়তে লাগলাম দিনের পর দিন। সেটাকেই বিষন্নতা বলে আজকাল!

সেই বয়সের অল্প বুদ্ধি আর স্বল্প অভিজ্ঞতায় তাদের আচরণের মূল বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। মূল বিষয়টা ছিল আমাকে নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য এমন একটা কিছু বলা যাতে তাদের কাজও হয় এবং আমার মাথাও নিচু হয়ে থাকে। তারা সফল হয়েছিল। বহুবছর মুখ খোলা তো দুর; মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই পারিনি। তবে, অন্যায়ভাবে অর্জন যেমন টিকে থাকে না তেমনি আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অর্জন করা তাদের সাফল্য মুখ থুবড়ে পড়েছিল এক সময়। 

তবে, প্রাথমিকভাবে আমি ভীষণভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম কারণ আমি লোকটাকে খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম। সত্যিকারের ভালবাসা। স্বামীর কাছে সেই একই সত্যিকারের ভালবাসা পাচ্ছিলাম না। মনে করতাম, আমার চেহারাই তার জন্য দায়ী। আরও মনে হোত রাতে মানুষটা আমাকে ভালবাসে কিন্তু দিনে যখন আমার চেহারাটা দেখে তখন আর ভালবাসতে পারে না। শ্বশুরবাড়িতে অন্য সমস্যাগুলোকে আমলেই নিতে পারতাম না। শুধু প্রচন্ড একটা অদ্ভুত মানসিক কষ্ট ছিল। শ্বাশুড়ি মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন,
-আহা ছেলেটারে কি বিয়া করাইলাম! ছেলেটা খুশি হইতে পারল না। 
অথবা ননদের কাছে দু:খ করে বলতেন,
-জানিস তোর বান্ধবীর মা কি বলছে?
-কি বলছে আম্মা?
-বলছে, কি দেইখা আমার সোনার টুকরা ছেলের জন্য এরকম বৌ নিয়া আসলাম!
শ্বশুর সাহেব চুপচাপ থেকে যেন শ্বাশুড়িকেই সমর্থন জানতেন। শ্বাশুড়ির কথা আমার শরীরে বা মনে কোথাও লাগত না। আমি এক দু:খ নিয়েই পড়ে থাকতাম, 
'আমি সুন্দরী নই। আমার চেহারা খারাপ সেজন্য আমার স্বামী আমাকে ভালবাসেনা' 
কোনদিন বাবার বাড়িতে, কোন বান্ধবীর কাছে বা কারো কাছে কথাটা বলতেও পারতাম না। নিজেকে খুব ছোটো লাগত! আমার চেহারা খারাপ বা আমি সুন্দরী নই সেজন্য আমার স্বামী আমাকে পছন্দ করেনা। বিষয়টা বড় অপমানেরও! বিষন্নতা নিয়েই কাটতে লাগল জীবন।
প্রথমদিন বিষয়টা জানার পর অনেক কেঁদেছিলাম। চোখের সেই পানিতে বহুবছর যাবত ভিজেছি। শ্বশুরবাড়িতে কিংবা স্বামীর সান্নিধ্যেও অনেকগুলো বছর বিষাদ, বিসন্নতা, অপমান, বঞ্চনা বয়ে বেড়িয়েছি মাথা নিচু করে কারণ আমার চেহারা ভাল না! আর আমার যে সবচেয়ে বড় গুন; সুন্দর করে কথা বলার ক্ষমতা সেটা তো যেন লজ্জায়, অপমানে মুখ লুকিয়ে হারিয়েই গেল! কার সাথে কথা বলব? কি কথা বলব? আমি চুপচাপ হয়ে গেলাম। সে বাড়িতে এসে আমার মত উচ্ছল প্রাণবন্ত একটা মেয়ে যে দিন দিন মনে মরে যাচ্ছিল সেটা তাদের কারে চোখেই পড়েনি বরং আমার নতুন দোষ যুক্ত হয়েছিল, ‘গোমড়ামুখি’ এবং ‘মাউটাচাপা’ তিনটা দোষের কথা শুনতে শুনতে আমার বয়স বাড়তে লাগল। 

আমার বিয়ের পনের বছর হয়ে গেছে। বিয়ের পর দেশে ছিলাম কয়েকবছর। পরে আমিও প্রবাসী হয়েছি। বয়স পনের বছর বেড়েছে। বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান সবই বেড়েছে। শিখেছি, মানুষ শিক্ষিত হলেই যে ভাল হবে তা নয়। অশিক্ষিত মানুষ যেমন ভাল হতে পারে তেমনই শিক্ষিত মানুষও হতে পারে খারাপ। ভাল মানুষ হতে মন লাগে। সে মনটা আমার স্বামীর বা তার পরিবারের নেই। সেজন্য আমাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলতে ওদের বাধত না। ওদের আনন্দই ছিল আমাকে কষ্ট দিয়ে দমিয়ে রাখা।

এখন আমি আর ভালবাসার কাঙাল না। জীবনে অন্যকে ভালাবাসা বা অন্যের ভালবাসা পাওয়ার চেয়েও অনেক বড় বিষয় হচ্ছে নিজেকে ভালাবাসা। ভুল মানুষকে ভালবাসলেও সেটা শুধরে নিয়ে নিজেকেই ভালবাসা উচিত। আমি এখন মনের দিক থেকেও শক্ত ও মজবুত। আমার চেহারা আমার পরিচয় ও গর্ব, আমার স্বকীয়তা, আমার বৈশিষ্ট্য। আমি সেই চেহারাকে ভালবাসি। অন্য কেউ ভালবাসলে ভাল তবে না ভালবাসলে অসুবিধা নেই। 
নিজেকে আজকের অবস্হায় নিয়ে আসার জন্য, বিষাদ থেকে বের করার জন্য এবং সর্বোপরী নিজেকে সম্মান প্রদর্শন করতে শেখার জন্য, বেশ কয়েক বছর আগে হঠাৎই একদিন আমার প্রথম পদক্ষেপ ছিল মুখ খোলা। একদিন আমার স্বামী আমার চেহারা নিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎই বলে ফেললাম,

-নিজের চেহারাটা আয়নায় কখনও দেখেছ? আগে নিজের চেহারাটা দেখে আসো। তারপর আমার চেহারা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবে। 

আমার কথা শুনে স্বামী সাহেবের মুখ ঝুলে গিয়েছিল। আমি আর পিছু হটে যাইনি। তারপর থেকে প্রতিটা আক্রমণের পাল্টা জবাব দিয়েছি। 
এখন আমি ভাল আছি। আমার চেহারা নিয়ে কেউ আমাকে ঘাটায় না। সংসার চলছে তারমত। সম্পর্কও আছে তার জায়গায়। নেই কোন অপমান, অবহেলা, বিষাদ। আমি ভাল আছি আমার সন্তানদের সাথে তৈরি করা ভুবনে। 
যেটা না বললেই নয়, কারো চেহারা নিয়ে কথা বলা পাপ। আমিও সেই পাপ করেছি শুধু নিজেকে রক্ষা করতে। হয়ত, সৃষ্টিকর্তা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। 

# প্রতিবাদ #
(গল্প)
তাসনুভা সোমা

Post a Comment

1 Comments

Joy said…
মানুষ বড় সার্থপর